২০২৬ সাল

ডলারের অবমূল্যায়নের সুযোগে উদীয়মান বাজারগুলোর শক্তিশালী সূচনা

উদীয়মান বাজারগুলো নতুন বছরের শুরু থেকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় রয়েছে, যাকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন ধারা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উদীয়মান বাজারগুলো নতুন বছরের শুরু থেকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় রয়েছে, যাকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন ধারা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ডলারের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে উদীয়মান বাজারগুলো। এর পাশাপাশি উচ্চ সুদহার, এআই খাতের উল্লম্ফন ও পণ্যবাজারে দামের উত্থান মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিকল্প বাজারে নজর দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে এসব উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর শেয়ার, বন্ড ও মুদ্রাবাজারে উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ দেখা যাচ্ছে। খবর এফটি।

ডলারের বিনিময় হার সম্প্রতি চার বছরের ন্যূনতম স্তরে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগকারীদের যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে প্ররোচিত করেছে অভিমত বিশ্লেষকদের। বিশেষ করে ডলারের হিসাবে, তুরস্ক, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, চিলি, মেক্সিকো ও তাইওয়ানের শেয়ারবাজার চলতি মাসে অন্তত ১০ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছে। অন্যদিকে কলম্বিয়া ও কোরিয়ায় বেড়েছে ২০ শতাংশের বেশি। এতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে মুদ্রার মান ও পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং এআইর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ঊর্ধ্বমুখিতা।

বিশ্বের প্রধান মুদ্রাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে ব্রাজিলিয়ান রিয়াল, মেক্সিকান পেসো, চিলিয়ান পেসো ও দক্ষিণ আফ্রিকার র‌্যান্ড। চলতি বছর এসব মুদ্রা বিনিময় হারে ডলারের তুলনায় ৫-৬ শতাংশ শক্তিশালী রয়েছে। এর সঙ্গে উচ্চ সুদহারের সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত।

ব্যাংক অব আমেরিকার গ্লোবাল ইমার্জিং মার্কেট ফিক্সড-ইনকাম স্ট্র্যাটেজি প্রধান ডেভিড হাউনার বলেন, ‘উদীয়মান বাজারের মৌলিক ভিত্তি কিছুদিন ধরেই উন্নত হচ্ছে। কিন্তু ডলার দুর্বল না হলে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা এদিকে নজর দিত না।’

অনেক উদীয়মান দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত কয়েক বছর মূল্যস্ফীতির তুলনায় বেশি সুদহার নির্ধারণ করেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল মূলধন যেন দেশের বাইরে চলে না যায়। কিন্তু মার্কিন বাজার ও ডলার বেশি শক্তিশালী থাকায় এ চেষ্টা তেমন ফল দেয়নি। মরগান স্ট্যানলির এফএক্স অ্যান্ড ইমার্জিং মার্কেট স্ট্র্যাটেজির প্রধান জেমস লর্ডের মতে, এখন ডলার দুর্বল হতে শুরু করেছে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও স্থিতিশীলতার কারণে বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছে।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের এমএসসিআই উদীয়মান বাজারের শেয়ার সূচক জানুয়ারিতে প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে, যা গত বছর বেড়েছিল ৩১ শতাংশ। এতে সূচকটির মূল্য চলতি মাসে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়ে ২৮ ট্রিলিয়নে পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালের শুরুতে ছিল ২১ ট্রিলিয়ন। একই সময় উন্নত অর্থনীতির শেয়ার সূচক এমএসসিআই ওয়ার্ল্ড ২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।

ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষণ অনুসারে, গত বছর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগনির্ভর আন্তর্জাতিক লং-অনলি ফান্ডগুলো এশিয়ার (জাপান বাদ দিয়ে) বাজারে ১০ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের শেয়ার কিনেছে। অন্যান্য উদীয়মান বাজারে তারা ৫ হাজার ৯০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। একই সময় মার্কিন শেয়ারবাজার থেকে ১৬ হাজার কোটি ডলার তুলে নিয়েছে।

তাইওয়ান ও কোরিয়ার পুঁজিবাজারে চালিকাশক্তির ভূমিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে চিপ সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ার। অন্যদিকে খনি ও ব্যাংকনির্ভর দক্ষিণ আফ্রিকার এমএসসিআই ব্লুচিপ সূচক ১৫ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

নাইনটি ওয়ানের ইকুইটি পোর্টফোলিও ম্যানেজার আর্চি হার্ট বলেন, ‘স্বর্ণ, রুপা ও মেমরি চিপের দাম সবই দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ডলারের দুর্বলতাও উদীয়মান বাজারের শেয়ারদর বাড়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ।’

অ্যাশমোর গ্রুপের ইমার্জিং মার্কেট ইকুইটি ম্যানেজার এডওয়ার্ড এভানস বলেন, ‘শেয়ারদর শুধু এআইর চাহিদা বৃদ্ধি বা ডলারের দুর্বলতার কারণে বাড়ছে না। লাতিন আমেরিকার ফিনটেক খাত ও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মতো উন্নয়নশীল দেশের অনেক কোম্পানি বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে।’

উদীয়মান অর্থনীতিতে ফিক্সড ইনকাম অ্যাসেটে বিনিয়োগ এখন অনেক উন্নত দেশকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। জেপি মরগানের উদীয়মান বাজারের লোকাল কারেন্সি বন্ড সূচক বছরের শুরু থেকে ২ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালে বেড়েছিল ১৯ শতাংশ। একই সময় উচ্চ ইল্ডের মার্কিন বন্ডগুলো বেড়েছে ১ শতাংশ। জেপি মরগান সূচকে লাতিন আমেরিকার বন্ড বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ, এতে প্রধান অনুঘটক ছিল স্থানীয় মুদ্রার উত্থান।

পিকটেট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ইমার্জিং মার্কেট ডেট প্রধান আলপের গোকের বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা ডলার অ্যাসেট বিক্রি করে উদীয়মান বাজারে বিনিয়োগ করছে না, বরং নতুন মূলধনের বিকল্প খুঁজছে। উদীয়মান বাজারে রয়েছে অন্যতম বিকল্প লোকাল কারেন্সি বন্ড।’

উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রায় ইস্যুকৃত সরকারি বন্ড ও করপোরেট বন্ড মার্কেট প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা মার্কিন ট্রেজারি মার্কেটের সমান। কিন্তু গত দশকে চীনের বাইরে এ বাজারে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ স্থিতিশীল ছিল, কারণ ডলার শক্তিশালী ছিল। অবস্থা পরিবর্তন হতেই গত এক বছরে বিনিয়োগপ্রবাহ বেড়েছে।

মরগান স্ট্যানলির জেমস লর্ড বলেন, ‘এখন শুধু হেজ ফান্ড নয়, বাস্তব বিনিয়োগ ও উদীয়মান বাজারের লোকাল কারেন্সি বন্ডে হচ্ছে, যা সরকারি ব্যালান্স অব পেমেন্ট ডেটায়ও দেখা যাচ্ছে।’

আরও